প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন: সনদের চেয়ে সংস্কৃতি কেন বেশি শক্তিশালী

প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন: সনদের চেয়ে সংস্কৃতি কেন বেশি শক্তিশালী

ড. শাহ মো. আহসান হাবীব

স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীনতার কাঠামো আইন দেয়, কার্যকারিতার শক্তি দেয় সংস্কৃতি। স্বায়ত্তশাসন বিলাসিতা নয়। এটি কার্যকারিতার মৌলিক শর্ত। স্বাধীনতা সিদ্ধান্তের মান উন্নত করে; অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ অনিশ্চয়তা বাড়ায়। নিরপেক্ষতা ছাড়া বিশ্বাস গড়ে ওঠে না। প্রশাসন, অর্থনীতি, আর্থিক খাত, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা-সব ক্ষেত্রেই একই সত্য প্রযোজ্য। অযাচিত চাপমুক্ত প্রতিষ্ঠান নীতিগতভাবে স্থির থাকে। তারা প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেয়। তারা জনপ্রিয়তার মোহে পড়ে না, এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দেয়। ব্যক্তিগত বা সাময়িক প্রভাবকে দূরে রাখে। এই স্বাধীনতা বিশেষ সুবিধা নয়; এটি দক্ষ কাজের অবকাঠামো। একটি কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থায় এই অবকাঠামো না থাকলে নীতিনির্ধারণ ভঙ্গুর হয়। সিদ্ধান্ত বারবার বদলে যায়। বাজারে সংকেত অস্পষ্ট হয়। নাগরিকের আস্থা ক্ষয় হয়। ফলে উন্নয়নের গতি মন্থর হয়, অথবা আশাব্যঞ্জক হয় না।

কার্যকর শাসনের ভিত্তি হলো দক্ষতা ও কর্তৃত্বের সামঞ্জস্য। সিদ্ধান্ত সেখানে যেতে হবে, যেখানে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কেন্দ্রীভূত। যেখানে জ্ঞান আছে, সেখানে কর্তৃত্ব থাকা উচিত। নিয়মের ধারাবাহিক প্রয়োগ আস্থা বাড়ায়। অযৌক্তিক প্রভাব নীতির স্থায়িত্ব নষ্ট করে। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান নীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারে। ধারাবাহিকতা বিনিয়োগে আস্থা আনে, আর আস্থা লেনদেনের খরচ কমায়। কম খরচ সমন্বয়কে সহজ করে। অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক তত্ত্ব এই যুক্তিকে সমর্থন করে। রাজনৈতিক প্রভাব সিদ্ধান্তকে বিকৃত করতে পারে। দক্ষতাহীন তদারকি ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ায়। সুসংগঠিত প্রতিষ্ঠান অনিশ্চয়তা হ্রাস করে। ক্ষমতা ও দক্ষতার সামঞ্জস্যতা ভালো ফলাফল দেয়। তাই স্বায়ত্তশাসন নিয়ন্ত্রণহীনতা নয়; এটি কর্তৃত্বের যুক্তিসঙ্গত বিন্যাস। এই বিন্যাস না থাকলে প্রতিষ্ঠান প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদি কৌশল অনিশ্চিত হয়, এবং নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়।

এই আলোচনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। মুদ্রানীতি স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক চাপে পরিচালিত হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়। সুদের হার নির্ধারণ যদি জনপ্রিয়তার বিবেচনায় হয়, তবে আর্থিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়ে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা তাই কেবল একটি প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার শর্ত। মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা নিয়ন্ত্রণে বিশ্বাস অপরিহার্য। সেই বিশ্বাস আসে নীতির ধারাবাহিকতা থেকে। ধারাবাহিকতা আসে প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন থেকে। তবে এই স্বাধীনতা সীমাহীন নয়। এটি স্পষ্ট লক্ষ্য, স্বচ্ছ যোগাযোগ ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে পরিচালিত হতে হয়। আর এ ক্ষেত্রে ঘোষণা এক জিনিস; চর্চা আরেক জিনিস। কাগজে স্বাধীনতা লেখা থাকলেই তা কার্যকর হয় না। যে কোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কাঠামোর চেয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি, পেশাগত আচরণ ও নীতিগত দৃঢ়তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আইনগত স্বীকৃতি প্রাথমিক শর্ত তৈরি করে; কিন্তু বাস্তব বিশ্বাস গড়ে ওঠে ধারাবাহিক সিদ্ধান্ত, স্বচ্ছ ব্যাখ্যা ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের মাধ্যমে। সরকারের নজর কাড়া বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনের আস্থা অর্জন করা কোনো ঘোষণার ফল নয়; এটি অর্জিত হয় পেশাগত মানদণ্ড রক্ষা করার মাধ্যমে।

আইনি স্বীকৃতি পেলেই স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত হয়-এমন ধারনার কোনো ভিত্তি নেই। বাস্তবতা এখানে ভিন্ন। সনদ কাঠামো দেয়; চরিত্র দেয় না। কাগুজে স্বাধীনতা কার্যকর স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করে না। ফল নির্ভর করে মানুষ ও সংস্কৃতির ওপর। প্রতিষ্ঠান নিজে কাজ করে না; মানুষ করে। নিয়মের ব্যাখ্যা মানুষ দেয়। ক্ষমতা মানুষ প্রয়োগ করে। দায়িত্বও মানুষের। স্বাধীনতাকে দায়িত্ব হিসেবে দেখলে সিদ্ধান্ত সতর্ক হয়। সুবিধা হিসেবে দেখলে বিচ্যুতি বাড়ে। একই ক্ষমতা ভিন্ন ফল দেয়। পার্থক্য গড়ে মানসিকতা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষেত্রেও এটি সত্য। আইনগত স্বাধীনতা থাকলেও যদি নেতৃত্ব পেশাগত সততা বজায় না রাখে, তবে নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার সীমিত আইনি পরিসরেও দক্ষ নেতৃত্ব নীতির মান রক্ষা করতে পারে।

স্বায়ত্তশাসন ও জবাবদিহিতা একে অন্যের পরিপূরক। স্বাধীনতা মানে দায়িত্বহীনতা নয়। স্বচ্ছতা আস্থা সৃষ্টি করে। পর্যালোচনা উন্নতির সুযোগ দেয়, আর ব্যাখ্যাহীন সিদ্ধান্ত সন্দেহ বাড়ায়। অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া বিশ্বাস ক্ষয় করে। তাই জবাবদিহিতা স্বাধীনতার সীমা নয়; তার সুরক্ষা। স্পষ্ট মানদণ্ড প্রয়োজন। নিরপেক্ষ মূল্যায়ন অপরিহার্য। এগুলো ছাড়া স্বায়ত্তশাসন অস্থির হয়ে পড়ে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও নিয়মিত প্রতিবেদন, সংসদীয় জবাবদিহি ও নীতিগত ব্যাখ্যা অপরিহার্য। স্বাধীনতা যদি ব্যাখ্যাহীন হয়, তবে জনআস্থা দুর্বল হবে। আবার অতিরিক্ত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপও বিশ্বাস নষ্ট করে। ভারসাম্যই মূল বিষয়।

অনেক প্রতিষ্ঠান কঠোর নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মধ্যেও উৎকৃষ্ট কর্মদক্ষতা প্রদর্শন করে। কারণ তাদের ভেতরের সংস্কৃতি দৃঢ়। নৈতিক মানদণ্ড স্পষ্ট। নেতৃত্ব দায়িত্বশীল ও সংযমী। সিদ্ধান্ত গ্রহণে পেশাগত সততা বজায় থাকে। আস্থা সময়ের সঙ্গে তৈরি হয়। ধারাবাহিক আচরণ বিশ্বাসকে শক্ত করে। বিশ্বাস বাড়লে তদারকি ধীরে ধীরে শিথিল হয়। স্বাধীনতার ক্ষেত্র স্বাভাবিকভাবে বিস্তৃত হয়। এখানে স্বায়ত্তশাসন দাবি করে আদায় করার চেয়ে; কর্মদক্ষতা ও বিশ্বাসের মাধ্যমে অর্জিত হয়। সংস্কৃতি দৃশ্যমান নয়, কিন্তু প্রভাব নির্ধারণ করে। সংস্কৃতি আচরণের মান নির্ধারণ করে এবং প্রতিষ্ঠানের পরিচয় গঠন করে। জবাবদিহিতার চর্চা বিশ্বাসকে টেকসই করে। বিপরীতে দুর্বল সংস্কৃতি আইনি ক্ষমতাকেও নিষ্প্রভ করে। কাগুজে স্বাধীনতা তখন বাস্তব প্রভাব হারায়। তাই স্বাধীনতার পরিমাণ নয়; তার ব্যবহারের ধরনই প্রকৃত মানদণ্ড। কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ যে কোনো নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই সত্য আরও স্পষ্ট। যদি নীতিনির্ধারণে নৈতিক দৃঢ়তা না থাকে, রাজনৈতিক সুবিধার কাছে নত হতে হয়, তবে আইনি স্বায়ত্তশাসনও কার্যকর থাকে না। আবার শক্ত নৈতিক সংস্কৃতি থাকলে সীমিত কাঠামোর মধ্যেও নীতিগত স্থিতি বজায় রাখা সম্ভব। ফলে স্বায়ত্তশাসনের স্থায়িত্ব শেষ পর্যন্ত সংস্কৃতির ওপরই নির্ভর করে।

স্বায়ত্তশাসন আস্থাভিত্তিক সম্পর্কের ওপর দাঁড়ায়। আস্থা ধারাবাহিক আচরণে তৈরি হয়। নেতৃত্ব উদাহরণ দিয়ে মানদণ্ড স্থাপন করে। অভ্যন্তরে স্বাধীনতা দমন করে বাইরে স্বাধীনতার দাবি করা যায় না। উদ্যোগকে নিরুৎসাহিত করলে বিশ্বাস কমে। বিশ্বাস একমুখী নয়; এটি পারস্পরিক; যা নিজে মানা হয় না, তা অন্যের কাছে দাবি করা দুর্বল যুক্তি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষেত্রে বাজার, সরকার ও নাগরিক-সবার সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। যদি অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া স্বচ্ছ না হয়, তবে বাহ্যিক বিশ্বাস টেকসই হয় না। এখানে আত্মসমালোচনা অপরিহার্য। আমরা কি আর্থিক খাতে সবাই অন্যের পেশাগত ক্ষেত্রকে সম্মান করার সংস্কৃতি তৈরি করতে পেরেছি? আমরা কি নিয়ন্ত্রণে সংযত? আমরা কি ক্ষমতা প্রয়োগে ন্যায়সঙ্গত? এগুলো কেবল নৈতিক প্রশ্ন নয়; এগুলো প্রাতিষ্ঠানিক স্থায়িত্বের শর্ত। আর মনে রাখা প্রয়োজন, স্বায়ত্তশাসন সময়সাপেক্ষ। এটি ধাপে ধাপে গড়ে ওঠে। ধারাবাহিক দক্ষতা আস্থা তৈরি করে। নৈতিকতা বিশ্বাসকে স্থিতিশীল করে। প্রমাণিত কর্মদক্ষতা স্বাধীনতার ক্ষেত্র বিস্তৃত করে।

স্বায়ত্তশাসনের তিন স্তম্ভ স্পষ্ট। শক্ত আইনি কাঠামো। কার্যকর জবাবদিহিতা। দায়িত্বশীল সংস্কৃতি। একটি অনুপস্থিত হলে ভারসাম্য ভেঙে যায়। কাঠামো না থাকলে বিশৃঙ্খলা বাড়ে। জবাবদিহিতা না থাকলে আস্থা কমে। সংস্কৃতি না থাকলে কাঠামো নিষ্ক্রিয় হয়। স্বাধীনতা ও তদারকি পরস্পরবিরোধী নয়। যুক্তিসঙ্গত তদারকি স্বাধীনতাকে শাণিত করে। অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ উদ্ভাবন কমায়। সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীনতা শৃঙ্খলা ভাঙে। ভারসাম্যই স্থিতিশীলতার শর্ত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা এই ভারসাম্যের সূক্ষ্ম উদাহরণ। নীতিগত স্বাধীনতা থাকতে হবে। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে জবাবদিহিতাও থাকতে হবে।

স্বায়ত্তশাসন নিজেই লক্ষ্য নয়; এটি উন্নত সিদ্ধান্তের উপায়। এটি দক্ষতার স্বীকৃতি। এটি বিশ্বাসের প্রতিফলন। স্বাধীনতার দাবি সক্ষমতার প্রমাণ দাবি করে। শৃঙ্খলাহীন স্বাধীনতা ঝুঁকিপূর্ণ। দায়িত্বশীল স্বাধীনতা স্থিতি আনে। সংস্কৃতি সময়ে গড়ে ওঠে। নেতৃত্ব এতে কেন্দ্রীয়। উদাহরণ কথার চেয়ে কার্যকর। স্বচ্ছতা নীরব শক্তি। প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত বিতর্ক কমায়। ব্যাখ্যা সন্দেহ হ্রাস করে। ভুল স্বীকার বিশ্বাস বাড়ায়। এই চর্চাই স্বায়ত্তশাসনকে কার্যকর করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সকল প্রতিষ্ঠানের জন্য এই নীতিগুলো প্রযোজ্য। কারণ অর্থনৈতিক স্থিতি, সামাজিক আস্থা ও নীতিগত ধারাবাহিকতা একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত।

শেষ প্রশ্ন নীতিগত। আমরা কি স্বাধীনতা চাই, নাকি দায়িত্বশীল স্বাধীনতা? আমরা কি ক্ষমতা চাই, নাকি বিশ্বাস? আমরা কি নিয়ন্ত্রণ চাই, নাকি সক্ষমতা? প্রতিষ্ঠান ভিতর থেকে শক্তিশালী হয়। আইন কাঠামো দেয়। সংস্কৃতি প্রাণ সঞ্চার করে। জবাবদিহিতা স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। তিনটির সমন্বয়েই স্বায়ত্তশাসন কার্যকর হয়। সনদ প্রয়োজনীয়। সংস্কৃতি নির্ধারক। ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। দায়িত্ব অপরিহার্য। প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা আচরণে প্রতিষ্ঠিত হয়, আর অনুশীলনে টিকে থাকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক হোক বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানই হোক— স্বায়ত্তশাসনের সাফল্য নির্ভর করে এই ভারসাম্যের ওপরই।

লেখক: অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট এবং চেয়ারম্যান, ডিনেট

Source: https://jatiyoarthoniti.com/2026/03/02/প্রাতিষ্ঠানিক-স্বায়ত্ত